শিরোনাম:
ঢাকা, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১ চৈত্র ১৪৩২
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বজ্রকণ্ঠ "সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা", ঢাকা,নিউ ইয়র্ক,লন্ডন থেকে প্রকাশিত। লিখতে পারেন আপনিও। বজ্রকণ্ঠ:” সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা ” আপনাকে স্বাগতম। বজ্রকণ্ঠ:: জ্ঞানের ঘর:: সংবাদপত্র কে বলা হয় জ্ঞানের ঘর। প্রিয় পাঠক, আপনিও ” বজ্রকণ্ঠ ” অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ” বজ্রকণ্ঠ:” সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা ” কে জানাতে ই-মেইল করুন-ই-মেইল:: [email protected] - ধন্যবাদ, সৈয়দ আখতারুজ্জামান মিজান

Bojrokontho
বুধবার ● ২৫ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » বিশেষ » স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা
প্রথম পাতা » বিশেষ » স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা
৫৫ বার পঠিত
বুধবার ● ২৫ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা

ড. মাহরুফ চৌধুরী
স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা
২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং জাতীয় জীবনে একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী মুহূর্ত। দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একটি চলমান, কিন্তু এখনো অসমাপ্ত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের প্রকল্পের মূর্তপ্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। আমাদের এই অর্জন ছিল উপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা। সেই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আজ আরও তীক্ষ্ণ, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটি হলো, এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, নাকি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কেবল শাসকের হাতবদল ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র অপরিবর্তিত থেকেছে, আর প্রান্তিক মানুষ রয়ে গেছে একই বাস্তবতায় আবদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কেবল আবেগের আলোকে নয়, বরং তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ইংরেজ চিন্তক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তাঁর ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্রকে একটি সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খলা রোধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর দৃষ্টিতে, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল সংঘাতপূর্ণ; তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তীকালে অপর ইংরেজ চিন্তক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সংশোধন করেন। লক যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো পরম ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের সম্মতি ও তাদের প্রাকৃতিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুইস চিন্তক জাঁ-জাক রুশো (১৭১২–১৭৭৮)‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল)-র ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নয়; এটি নিহিত থাকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থে। রাষ্ট্র তখনই বৈধ ও কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তা এই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও অধিকারকে প্রতিফলিত না করে, তবে তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ নামমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হয় না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর ও স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানা গণমানুষের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায় যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত, কেন্দ্রাভিমুখী গোষ্ঠীর ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং সম্পদ বণ্টনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রতীকী স্তরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রটি থেকে তারা বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)-র ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এমন এক সম্মতিনির্ভর বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে তাদের আধিপত্য স্বাভাবিক, এমনকি অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে যে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।
এখানে ফরাসী ঐতিহাসিক ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘ক্ষমতা তত্ত্ব’ (পাওয়ার থিওরি) এই আলোচনাকে আরও গভীরতা প্রদান করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্র বা শীর্ষস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক, বিস্তৃত এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়েও ক্ষমতা নিজেকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। ফলে ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ, যেমন সরকার বা নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, অদৃশ্য কাঠামোগত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি লক্ষণীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের সামনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা, যেখানে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে যে, তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। ফলে স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এক সীমাবদ্ধ ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনগণের মাঝে পরিবর্তনের প্রত্যাশা বারবার জাগ্রত হলেও, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তা পূর্ণতা পায় না।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার শাসকগোষ্ঠীর গণবিচ্ছিন্নতা কেবল সাম্প্রতিক কোনো বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফল, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা মূলত একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’ যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বার্থ সংরক্ষণ। এই কাঠামোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, আর প্রশাসন ছিল জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের হাতিয়ার। পাকিস্তান আমলেও এই একই ধারা বহুলাংশে অব্যাহত থাকে, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকে যায়। স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে দিয়ে জনগণের মনে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং উন্নয়ন ও সম্পদের সুফল দেশের সব মানুষের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বহু ক্ষেত্রে সেই পুরোনো শোষণমূলক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত থেকে গেছে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিতই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতা হলো দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক বৃত্তবদ্ধতা, যা সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থে সীমিত করে ফেলে। এ প্রসঙ্গে জার্মান বংশোদ্ভুত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট মিখেলসের (১৮৭৬-১৯৩৬) ‘অলিগার্কের লৌহ আইন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো সংগঠন, তা যতই গণতান্ত্রিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ক্ষমতাবান এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে এমন সব কলাকৌশল অবলম্বন করে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই এমন এক অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ অত্যন্ত সীমিত, এমনকি প্রায় অসম্ভব। পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব, আনুগত্যভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন- এসব উপাদান মিলিয়ে একটি সংকীর্ণ বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবাহকে সাধারণ জনগণের দিকে না নিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, তার কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট কেবল সাময়িক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে শোষণমূলক কাঠামো এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ একে অপরকে শক্তিশালী করে চলেছে। এর ফলে স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা জনগণের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি।
সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে তা কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনারূপে নয়, বরং গণমানুষের সঞ্চিত বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার এক প্রতীকী বিস্ফোরণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই অর্থে, ঘটনাটিকে জাঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল) অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবির এক ধরনের পুনরুত্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে। তবে এই জাগরণ, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাশিত প্রতিফলন পায়নি। অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনীহা, বিলম্ব এবং নানা কৌশলগত তালবাহানার আশ্রয় নেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে তা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধী। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে যে পরিবর্তনের দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘পথের উপর নির্ভরতা’ (পাথ ডিপেন্ডেন্সি) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার বিন্যাস এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহজে বাস্তবায়িত হয় না, কারণ বিদ্যমান কাঠামো নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নানা কলাকৌশলের প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, নীতিনির্ধারণের ধরণ এবং ক্ষমতার চর্চার মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয় অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার বা দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থেকে যায়। গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ বিদ্যমান থাকলেও, তার ভেতরকার চর্চা ও কার্যকারিতা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে অনেকাংশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্রের ভাষ্য বজায় রেখেই এক ধরনের কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্র পুনরুৎপাদিত হয় যা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয় মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে তাদের আবদ্ধ করে রাখে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিত্রাণহীন নিয়তির মধ্যে।
এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন যা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর আংশিক পরিবর্তনের প্রয়াসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার বিন্যাসের একটি সামগ্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। এখানে প্রশ্নটি কেবল কে শাসন করবে, তা নয়; বরং কিভাবে শাসন পরিচালিত হবে এবং সেই শাসনের উদ্দেশ্য কী হবে- এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। মার্কিন চিন্তক জন রলস (১৯২১-২০০২) তাঁর ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বিচার’ (জাস্টিস এজ ফেয়ারনেস) তত্ত্বে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিকভাবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। অর্থাৎ উন্নয়ন, নীতি এবং সম্পদ বণ্টনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানদের সুবিধা নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একটি সক্রিয়, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর জবাবদিহিতা আরোপ করতে, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলন- এই সবগুলো ক্ষেত্র সম্মিলিতভাবে একটি সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি কেবল জাতির জন্য অতীতের গৌরবময় অর্জন স্মরণের দিন নয়; বরং একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের পুনঃঘোষণা, একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার নবায়ণ। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবে যেখানে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে অনুভব করবে, এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে। অতএব, স্বাধীনতা দিবসে গণমানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তনই হোক আমাদের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি একটি জাগ্রত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ। অন্যথায় স্বাধীনতা একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু তার বাস্তব রূপ চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের একটি সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান, ক্রমবিকাশমান প্রকল্প হিসেবে দেখা; এবং সেই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গণমানুষের মুক্তি, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।

* লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য



বিষয়: #  #  #  #  #  #



বিশেষ থেকে আরও

​রাজনৈতিক কৌশল ও বাস্তবতা ​রাজনৈতিক কৌশল ও বাস্তবতা
জেনেভায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে  ড. মোহাম্মদ ইউনূসের আমলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ জেনেভায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের আমলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ
ইরানের তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করল যুক্তরাষ্ট্র
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা
ঈদ-উল-ফিতর সৌহার্দ্য ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে ঈদ-উল-ফিতর সৌহার্দ্য ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে
ছাতকবাসীর একটাই প্রত্যাশা-উপজেলা পরিষদ প্রশাসক হিসেবে দেখতে চান বিএন‌পির নজরুল ইসলামকে ছাতকবাসীর একটাই প্রত্যাশা-উপজেলা পরিষদ প্রশাসক হিসেবে দেখতে চান বিএন‌পির নজরুল ইসলামকে
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের শাড়ি পেলেন ইউনিয়ন মহিলা দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের শাড়ি পেলেন ইউনিয়ন মহিলা দলের সভাপতি
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এর আজীবন সদস্য হলেন কবি রিপন শান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এর আজীবন সদস্য হলেন কবি রিপন শান
বহুপাক্ষিক দুনিয়ায় ভারসাম্যের কূটনীতিতে বেশ সতর্ক অবস্থানে ভারত বহুপাক্ষিক দুনিয়ায় ভারসাম্যের কূটনীতিতে বেশ সতর্ক অবস্থানে ভারত

আর্কাইভ

---
খাটের নিচে তেলের খনি!
পাগলীও নিরাপদ নয়: শিবচরে ভুয়া সাংবাদিক আটক
চাঁদপুরে কোস্টগার্ডের অভিযানে ১০ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদককারবারি আটক
মুন্সিগঞ্জে কোস্টগার্ডের অভিযানে ৪ কোটি টাকার অবৈধ চিংড়ি রেনু জব্দ
৫ দিনের রিমান্ডে সাবেক এমপি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
জামিন পেলেন ইনু, মেনন ও বিচারপতি মানিক
চাঁপাইনবাবগঞ্জে শালিস বৈঠক ঘিরে সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ
ভারত থেকে জ্বালানি আমদানি নিয়ে সুখবর দিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
ঢাকার যানজট কমাতে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠক
কলম্বিয়ায় সামরিক বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত বেড়ে ৬৬
পূর্ণাঙ্গ বিজয় পর্যন্ত লড়াই চলবে, ঘোষণা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর
পদত্যাগ করলেন বিসিবি পরিচালক আমজাদ হোসেন
ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করলেন ট্রাম্প
রাণীনগরে পর্যটন এলাকায় দুই মাদক সেবির কারাদন্ড
মোংলায় অস্ত্র ও গুলিসহ বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীর সদস্য আটক
রাণীনগরে পিতা-পুত্রকে কারাদন্ড
রাণীনগরে ঈদ আনন্দের ভটভটি উল্টে কিশোর নিহত,আহত-৮
আপত্তিকর বক্তব্যের প্রতিবাদে ডিসি ডেভিল ইলিয়াসের অপসারণের দাবী
রাতের মধ্যে ২০ জেলায় ঝড়ের আশঙ্কা
দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদে ড্রাম ব্রিজ ভেঙে ৩ শিশু নিহত
সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান নিয়ে নতুনধারার ঈদ মেহমান
আদমদীঘিতে বোনের বাড়িতে ঈদ করতে এসে প্রতিপক্ষের হামলায় রাণীনগরের এক নারী নিহত
হরমুজ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহায়তা চান ট্রাম্প, যুদ্ধবিরতিতে অনাগ্রহ
বায়তুল মোকাররমে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত
আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর
গাবতলীর সর্ধনকুটি গ্রামে ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ বাড়ী-ঘর পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মাঝে বস্ত্র ও নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করলেন সাবেক এমপি লালু
ঈদ উল ফিতর উপলক্ষে দৈনিক উত্তর কোণ এর পক্ষে শাজাহানপুরে দুঃস্হদের মাঝে ঈদ সামগ্রী ও নগদঅর্থ বিতরণ করলেন সাবেক এমপি লালু
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে পিআইসি সিন্ডিকেটে পরিবর্তন : হাত বদল হলেও বন্ধ হয়নি ঘুষের লেনদেন
ঈদে ৩ দিনের সফরে সিলেট আসছেন বিরোধী দলীয় নেতা
দৈনিক উত্তর কোণ পরিবারের আয়োজনে গাবতলীতে দুস্থদের মাঝে ঈদ সামগ্রী