শুক্রবার ● ২৯ মে ২০২৬
প্রথম পাতা » বিশেষ » প্রবাসের হৃদয়ে এক টুকরো বাংলাদেশ
প্রবাসের হৃদয়ে এক টুকরো বাংলাদেশ
ড. আজিজুল আম্বিয়া::
![]()
নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা শুধু উৎসব নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের নাম নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যাচ্ছিল, এটি কেবল একটি বইমেলা নয়। চার দিনের এই আয়োজন যেন প্রবাসী বাঙালির আবেগ, স্মৃতি, শেকড়, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক বিশাল মিলনমেলা। বাইরে টানা বৃষ্টি, বৈরী আবহাওয়া, দীর্ঘ যাত্রা, ভিসা জটিলতা কিংবা ব্যস্ত অভিবাসী জীবনের ক্লান্তি কিছুই থামাতে পারেনি বাংলা ভাষার প্রতি মানুষের এই টানকে।
“যত বই তত প্রাণ” এই প্রতিপাদ্য যেন এবারের ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার প্রতিটি মুহূর্তে সত্য হয়ে উঠেছিল।
প্রবাসে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের শিশুদের হাতে যখন রঙতুলি, কেউ শহীদ মিনার আঁকছে, কেউ বাংলা অক্ষর লিখছে, তখন বোঝা যায় এই মেলা কেবল বই বিক্রির জায়গা নয়। এটি উত্তরাধিকার হস্তান্তরের একটি সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়।
মেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর বহুমাত্রিক উপস্থিতি। এখানে যেমন ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, তেমনি ছিলেন সমাজবিজ্ঞানী রওনক জাহান, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইন, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর, কবি সুবোধ সরকার, গবেষক, প্রকাশক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা।
এই উপস্থিতি শুধু আনুষ্ঠানিক ছিল না। তাঁরা কথা বলেছেন, স্মৃতি ভাগ করেছেন, বিতর্ক করেছেন, তরুণদের প্রশ্ন শুনেছেন, নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেছেন। মঞ্চের আলোচনার বাইরেও বইয়ের স্টল, করিডোর, আড্ডা কিংবা কফির টেবিলে চলেছে সাহিত্য ও সমাজ নিয়ে গভীর আলাপ।
অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বক্তব্য ছিল সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় দৃশ্যমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, আগামী ৩৫ বছরে তারা এ দেশের সমাজ-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে। এই কথার ভেতরে শুধু ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নেই, আছে প্রবাসী বাঙালির আত্মবিশ্বাসের ঘোষণাও।
অন্যদিকে অধ্যাপক রওনক জাহান নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সেটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের চিন্তা, ইতিহাস ও মূল্যবোধ নিয়ে যে আলোচনা সম্ভব, এই বইমেলা সেটিই প্রমাণ করেছে।
মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা-র দীর্ঘ তিন দশকের নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই এই মেলা আজ উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষাভাষীদের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ১৯৯২ সালে ছোট্ট পরিসরে শুরু হওয়া যে স্বপ্ন, আজ তা প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ।
এই মেলায় সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দৃশ্য ছিল তরুণদের অংশগ্রহণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা থেকে শুরু করে সাহিত্য বিতর্ক, কবিতা পাঠ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা কিংবা লেখক-পাঠক সংলাপ—সবখানেই নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তারা প্রশ্ন করেছে, শুনেছে, লিখেছে, ছবি তুলেছে, বই কিনেছে।
একটি বিষয় পরিষ্কার, বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ কেবল ঢাকায় বা কলকাতায় নির্ধারিত হবে না। নিউইয়র্ক, টরন্টো, লন্ডন, সিডনি কিংবা মেলবোর্নেও বাংলা ভাষার নতুন ভূগোল তৈরি হচ্ছে।
বিদেশের মাটিতে বইমেলা কেন দরকার—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এই চার দিনের প্রতিটি দৃশ্যে। কারণ অভিবাসী জীবনে ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় প্রজন্ম দ্রুত ভিন্ন সংস্কৃতির ভেতরে বড় হয়। সেখানে একটি বইমেলা হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক স্মৃতির আশ্রয়স্থল।
এখানে বই মানে শুধু সাহিত্য নয়। বই মানে শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ। বই মানে নিজের ভাষায় চিন্তা করার অধিকার। বই মানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা।
তবে এই মেলা আমাদের কিছু কঠিন প্রশ্নের সামনেও দাঁড় করায়। বাংলা বইয়ের পাঠক কি কমছে? নতুন প্রজন্ম কি সত্যিই বই পড়ছে? বাংলা প্রকাশনা কি আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কিন্তু সমাধানের পথ আছে।
প্রথমত, বাংলা বইকে অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছাতে হবে। ইমদাদুল হক মিলনের বক্তব্যে সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই উঠে এসেছে। বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ ভাণ্ডার এখনও বিশ্বসাহিত্যে যথেষ্ট পরিচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলা বইকে আরও সহজলভ্য করতে হবে। ই-বুক, অডিওবুক, আন্তর্জাতিক অনলাইন ডিস্ট্রিবিউশন ছাড়া আগামী প্রজন্মকে ধরা কঠিন।
তৃতীয়ত, শিশু-কিশোরদের জন্য আকর্ষণীয়, আধুনিক ও ভিজ্যুয়াল বইয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে। কারণ ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিশুদের ওপর।
চতুর্থত, প্রবাসের বাংলা স্কুল, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বইমেলাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বইকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত না করলে পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
এই বইমেলা আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছে—বাংলা ভাষার শক্তি এখনও অটুট। মানুষ এখনও বইয়ের ঘ্রাণ ভালোবাসে। এখনও প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে। এখনও বাংলা গান শুনে আবেগাপ্লুত হয়।
এই বিশাল আয়োজনের নেপথ্যে যাঁরা নিরবে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের সম্পৃক্ততা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শুধু সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবেই নয়, বরং প্রবাসে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার একজন নিবেদিত সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও তাঁকে বইমেলার বিভিন্ন আয়োজনে সক্রিয় দেখা গেছে। নতুন বই নিয়ে আলোচনা, লেখক-পাঠক সংলাপ, শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ এবং প্রবাসী লেখকদের পরিচিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিক ভূমিকা মেলাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বিশেষ করে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ছোটদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার সময় তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রতীকী। কারণ এই বইমেলার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু প্রতিষ্ঠিত লেখক বা প্রকাশকের সমাগম নয়, বরং নতুন প্রজন্মের হাতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়া। ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের মতো সাংস্কৃতিক কর্মীরা সেই সেতুবন্ধনের কাজটিই করে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে।
প্রবাসের সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকাও এবারের বইমেলায় নতুনভাবে আলোচিত হয়েছে। কারণ সংবাদমাধ্যম কেবল খবর প্রকাশ করেনি, তারা এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশীদার হয়ে উঠেছে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে টিকিয়ে রাখতে প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠকদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ভবিষ্যতের শক্তি হয়ে থাকবে।
টানা বৃষ্টির পর শেষ দিনের রোদ যেন প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আলো নিভে যায়নি।
প্রবাসের হৃদয়ে আবারও জেগে উঠেছিল এক টুকরো বাংলাদেশ।
আর সেই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম বড় শক্তি এখনও বই।লেখকঃ ড. আজিজুল আম্বিয়া, কলাম লেখক ও গবেষক ।
বিষয়: #এক #টুকরো #প্রবাস #বাংলাদেশ #হৃদয়










সিলেটের ফুটপাত সংকটের স্থায়ী সমাধানে লন্ডনের আদলে ‘স্ট্রিট মার্কেট’ মডেলের প্রস্তাব সৈয়দ মিজানের!
ঢাকার আকাশে ভিন্ন এক দৃশ্য, চোখ ফেরাতে পারছেন না কেউ
জনগণের অর্থ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের চিকিৎসা বিতর্ক: রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের লন্ডন সফরের ভেতরের খবর
উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত: রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব
দেখে কিছু বুঝি নাই, চেখে পেলাম রসের সাগর
র্যাকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ এক বছরে ব্র্যাকের সেবা পেয়েছেন ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ
কেন ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির ভরাডুবি হচ্ছে?
অভিবাসন ও অভিবাসীদের বিষয়ে তাঁর নীতিসমূহ
বিপদসীমায় সুতাং: মাছের পেটে প্লাস্টিক, জনস্বাস্থ্যে চরম ঝুঁকি 