শিরোনাম:
●   সুনামগঞ্জে ধর্ষক সামছুল হককে পালিয়ে যেতে সহায়তার ঘটনায় অভিযোগ দায়ের ●   টেকনাফে কোস্টগার্ডের অভিযানে ইয়াবাসহ দুই মাদক পাচারকারী আটক ●   রাণীনগরে কৃষি কর্মকর্তাদের অবহেলায় ভেস্তে গেছে ক্লাস্টার এডব্লিউডি প্রযুক্তি প্রদর্শনী প্রকল্প ●   মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ●   টেকনাফে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে বন্দি থাকা নারী ও শিশুসহ উদ্ধার ৭ ●   সুন্দরবনের কুখ্যাত দস্যু জোনাব বাহিনীর কাছে জিম্মি থাকা জেলে উদ্ধার ●   সুনামগঞ্জ শহরে অগ্নিকান্ডে ১৮টি দোকান পুড়ে ছাইভস্ম : ১০ কোটি টাকার ক্ষতি ●   দৌলতপর সীমান্তে বিজিবির পৃথক অভিযানে ভারতীয় মালামাল সহ একজনকে আটক ●   মুন্সিগঞ্জে কোস্টগার্ডের অভিযানে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ●   সিলেটে-টাঙ্গাইলে প্রকৌশলী সিন্ডিকেট! ছাতক ও সিলেট বিউবো প্রকল্পে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার তামার তার লুট!
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বজ্রকণ্ঠ "সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা", ঢাকা,নিউ ইয়র্ক,লন্ডন থেকে প্রকাশিত। লিখতে পারেন আপনিও। বজ্রকণ্ঠ:” সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা ” আপনাকে স্বাগতম। বজ্রকণ্ঠ:: জ্ঞানের ঘর:: সংবাদপত্র কে বলা হয় জ্ঞানের ঘর। প্রিয় পাঠক, আপনিও ” বজ্রকণ্ঠ ” অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ” বজ্রকণ্ঠ:” সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা ” কে জানাতে ই-মেইল করুন-ই-মেইল:: [email protected] - ধন্যবাদ, সৈয়দ আখতারুজ্জামান মিজান

Bojrokontho
বৃহস্পতিবার ● ২ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম পাতা » বিশেষ » নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার: এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
প্রথম পাতা » বিশেষ » নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার: এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
২২ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ২ এপ্রিল ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার: এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না

ড. মাহরুফ চৌধুরী
* লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
দেশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা অপমৃত্যু, তথা খুনের প্রেক্ষিতেই এই লেখাটির শিরোনাম নেওয়া হয়েছে দুটি কালজয়ী গান ও কবিতা থেকে। হায়দার হোসেন (১৯৬৩–) যে আত্মগ্লানি থেকে ‘নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার’ উচ্চারণ করেছিলেন, এটি কেবল সেই গানের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং আজকের বাস্তবতায় বেদনাহত অসংখ্য মানুষের মতো আমিও আমার ঘৃণা ও ক্ষোভের ভাষা খুঁজেছি এই উচ্চারণে। এই সুতীব্র ধিক্কার আসলে নিজের অক্ষমতার বিরুদ্ধে, আমাদের সম্মিলিত বিবেকের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে, এবং একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও সরকারের উন্নাসিক মনোভাবের বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রতিবাদ। এখানে ‘আমি’ ব্যক্তিগত হলেও, এর অন্তর্গত বোধটি গভীরভাবে সামষ্টিক; এটি আমাদের সবার দায়বোধের প্রতিফলন। অন্যদিকে, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’- এই উচ্চারণ কেবল একটি কবিতার শিরোনাম বা পঙ্‌ক্তি নয়; এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রত্যাখ্যান। এই পঙ্‌ক্তিটি উচ্চারণ করতে গিয়েই হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হয়। যদি এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না-ই হয়, তবে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমি কি এর বাইরে, নাকি এই নির্মম বাস্তবতার নীরব অংশীদার? নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮–২০১৪) যে ‘মৃত্যু উপত্যকা’র কথা বলেছেন, তা কোনো ভৌগোলিক সীমানা নয়; বরং একটি নির্লিপ্ত রাষ্ট্র ও সমাজের ভীতিকর অবস্থার প্রতীক। আজকের লেখার শিরোনাম হিসেবে এই প্রতিবাদী উচ্চারণ আর কেবল গানের কলি ও কবিতার পঙ্‌ক্তি নয়; এটি আমার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই দেওয়া এক তীব্র ধিক্কার।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে মৃত্যু আর ব্যতিক্রম নয়; বরং ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এক নির্মম বাস্তবতা। এখানে মানুষের জীবন নিরাপদ নয়; মৃত্যু হয়ে ওঠে দৈনন্দিন ঘটনা, আর জীবনের মূল্য ধীরে ধীরে অবমূল্যায়িত হচ্ছে। মানুষের মৃত্যুতে মানুষ এতটা আবেগহীন, অনুভূতিহীন ও প্রতিক্রিয়াহীন থাকতে পারে- এই ভাবনাই হৃদয়কে শঙ্কিত ও স্তম্ভিত করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৈতিক দর্শনের ভাষায় বললে, এটি সেই পর্যায়, যেখানে রাষ্ট্র তার মৌলিক ‘সামাজিক চুক্তি’ (সোসাল কন্ট্রাক্ট) রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং নাগরিকের জীবনরক্ষার ন্যূনতম দায়িত্বটুকুও পালন করতে পারে না। ফলে সামষ্টিক কল্যাণের বোধ থেকে জন্ম নেওয়া ‘দেশ’ ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ যে ভূখণ্ডে জীবন অনিরাপদ, তা মানচিত্রে একটি রাষ্ট্র হতে পারে, কিন্তু নৈতিক অর্থে সেটা একজন নাগরিকের কাছে ‘আমার দেশ’ হয়ে উঠতে পারে না। রাষ্ট্রতত্ত্বের প্রাচীন ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে মানুষের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। ইংরেজ চিন্তক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষের অবস্থা’র যে চিত্র তুলে ধরেছেন, সেখানে মানুষের জীবন ছিল ‘নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, নিকৃষ্ট, হিংস্র এবং সংক্ষিপ্ত’ (সলিটারি, পুওর, নাস্টি, ব্রুটিস এন্ড শট) তথা অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। যেখানে মানুষের জন্য জীবন ছিল অনিরাপদ, বিশৃঙ্খল এবং টিকে থাকার সংগ্রামে ভরপুর। সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করে, সেটিই ‘রাষ্ট্র’ যার মূল ভিত্তি একটি অলিখিত ‘সামাজিক চুক্তি’, যেখানে নাগরিক তার কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করে নিরাপত্তার বিনিময়ে। কিন্তু এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে: যদি রাষ্ট্র সেই ন্যূনতম দায়িত্ব অর্থাৎ নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হয়, তবে সেই সামাজিক চুক্তির বৈধতা কোথায় দাঁড়ায়?
প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের ভিত্তি একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি, যেখানে নাগরিক তার কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখানেই এক মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। যদি রাষ্ট্র সেই ন্যূনতম দায়িত্ব তথা নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হয়, তবে সেই সামাজিক চুক্তির বৈধতা কোথায়? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এটি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির গভীর সংকট। কারণ যে চুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র তার বৈধতা অর্জন করে, সেই চুক্তির প্রধান শর্তই যদি ভঙ্গ হয়, তবে নাগরিকের আনুগত্য, আস্থা ও কর্তব্যবোধসহ সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্র কেবল একটি ক্ষমতার কাঠামোতে পরিণত হয়; কিন্তু ন্যায়, নিরাপত্তা ও মানবিকতার আশ্রয়স্থল হিসেবে তার অস্তিত্ব ক্রমেই ফাঁপা হয়ে যায়। আমাদের দেশের বাস্তবতায় মৃত্যুর প্রকৃতি ও স্বাভাবিকতার ধারণা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। ‘দুর্ঘটনা’, ‘আত্মহত্যা’, ‘গণপিটুনী’, ‘গণধোলাই’, ‘ক্রসফায়ার’, ‘রাজনৈতিক সংঘর্ষ’- এই শব্দগুলো যেন একেকটি বিশেষ পর্দা বা চাঁদর, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম সত্য। সাধারণ মানুষের ‘সিস্টেমিক’ ও ‘সিস্টেম্যাটিক’ অপমৃত্যুকে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শব্দের নির্বাচন বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে, এমনকি সহিংসতাকেও এক ধরণের নীরব বৈধতা দিতে পারে। ফলে ঘটনাগুলো আর বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি হিসেবে প্রতিভাত হয় না; বরং সেগুলো একটি অভ্যস্ত, পুনরাবৃত্ত সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নেয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকীকরণ আসলে এক ধরনের ‘কাঠামোগত সহিংসতা’, যেখানে হত্যার দায় কোনো একক ব্যক্তি বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা একটি সমগ্র সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর বর্তায়।
নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী জোহান গালতুং (১৯৩০–২০২৪) যে ‘কাঠামগত সহিংসতা’-র (স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স) ধারণা দিয়েছেন, তার সঙ্গে এই বাস্তবতার গভীর সাযুজ্য রয়েছে। এখানে সহিংসতা সবসময় দৃশ্যমান না হলেও তার প্রভাব প্রতিনিয়ত জীবনহানির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ এখানে হত্যা কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার অবধারিত পরিণতি। এই প্রেক্ষাপটে ফরাসী ইতিহাসবিদ ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘জৈব-রাজনীতি’ (বায়োপলিটিক্স) ধারণাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শাসন করে না; বরং মানুষের জীবন, দেহ এবং সমগ্র জনগোষ্ঠির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই ক্ষমতা প্রয়োগ করে। ফলে কে বাঁচবে, কে মরবে, কোন জীবন মূল্যবান, আর কোন জীবন অবহেলিত- এই প্রশ্নগুলো নিছক নৈতিক বা মানবিক নয়; এগুলো গভীরভাবে রাজনৈতিকও বটে। যখন রাষ্ট্রের উদাসীনতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা ইচ্ছাকৃত নীতির ফলে কিছু মানুষের মৃত্যু ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে, তখন তা আর নিছক দুর্ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার এক নীরব কিন্তু কার্যকর রূপ, যেখানে জীবনরক্ষা নয়, বরং জীবনের অবমূল্যায়নই রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে, ইটালীয় চিন্তক জর্জিও আগামবেনের (১৯৪২-) ‘হত্যাযোগ্য’ (হোমো সাকের) ধারণাটি আমাদের এই বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাঁর বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়ে যে, আধুনিক রাষ্ট্র এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরি করে, যাদের জীবন আইনের দৃষ্টিতে কার্যত সুরক্ষাহীন; যাদেরকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তা বিশেষভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। অর্থাৎ তারা আইনের ভেতরে থেকেও আইনের সুরক্ষার বাইরে অবস্থান করে; রাষ্ট্রে বা সমাজে তারা এক ধরনের ‘জীবন্ত পরিত্যক্ততা’-র (লিভিং এবানডনমেন্ট) শিকারহয়ে থাকে।
আমাদের সমাজে যখন গণপিটুনী, গুম, খুন-খারাবী বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনা ঘটে এবং তা কার্যত শাস্তিহীন থেকে যায়, তখন সেই ভুক্তভোগীরা যেন প্রাচীন রোমান আইনের ‘হোমো সাকের’ ধারণারই আধুনিক প্রতিরূপ হয়ে ওঠে। কারণ তখন তাদের মৃত্যু আর বিচারের বিষয় থাকে না; বরং তা এক ধরনের নীরব স্বীকৃতি পেয়ে যায় যেন এই মৃত্যুগুলো ঘটতেই পারে, কিংবা ঘটাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই নির্মম বাস্তবতার মানবিক ব্যথা আমাদের লোকস্মৃতি ও সাহিত্যও প্রতিফলিত হয়েছে। হায়দার হোসেনের গানের পঙক্তি, ‘যার চলে যায় সেই বোঝে, হায় বিচ্ছেদে কী যন্ত্রণা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে একেকটি ভাঙা পরিবার, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি আর শূন্যতা। সে যাই হোক, এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমাদের এক অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে, এদেশে অপমৃত্যু কেবল বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। আর এই কাঠামোর মধ্যে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছি। রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, রাজনৈতিক স্বার্থের প্রাধান্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং সামাজিক নীরবতা সব মিলিয়ে এদেশে এক ধরনের ‘মৃত্যুর সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠেছে। এই সংস্কৃতিতে জীবনের চেয়ে মৃত্যু বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, আর ন্যায়বিচারের চেয়ে অবিচার বেশি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ফলে প্রশ্নটি কেবল রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আমাদের সামষ্টিক নৈতিকতার গভীর সংকটকেও উন্মোচন করে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় উৎসবগুলোর তাৎপর্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ঈদ বা স্বাধীনতা দিবসের মতো উদ্‌যাপন তখন এক ধরনের নৈতিক বৈপরীত্যের সৃষ্টি করে। একদিকে আমরা স্বাধীনতার গৌরব উদ্‌যাপন করি, অন্যদিকে সেই স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা মানুষের নিরাপদ জীবন ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে উৎসবগুলো নিছক আনন্দের উপলক্ষ না হয়ে বরং এক ধরনের অস্বস্তিকর আত্মপ্রতারণায় রূপ নেয়, যেখানে উদ্‌যাপন আর বাস্তবতার মধ্যে এক গভীর ফাঁক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দর্শনের ভাষায় একে বলা যেতে পারে ‘কার্যসম্পাদনমূলক জাতীয়তাবাদ’ (পারফরমেটিভ ন্যাশানালিজম) যেখানে প্রতীকী উদ্‌যাপন বাস্তব দায়বদ্ধতার অভাবকে আড়াল করে। প্রশ্ন হলো, তাহলে সমাধান কোথায়?
প্রথমত, আমাদের এই বাস্তবতাকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা ভাঙতে হবে। সহিংসতার এই স্বাভাবিকীকরণই সংকটকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি। সমাজমনোবিজ্ঞানের আলোচনায় একে ‘সংবেদনশীলতা হ্রাস’ (ডিসেন্সিটাইজেশান) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ বারবার সহিংসতার মুখোমুখি হতে হতে আমাদের আবেগ, অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা ভোঁতা হয়ে যায়। এই মানসিক অবস্থা পরিবর্তন ছাড়া কোনো কাঠামোগত সংস্কারপ্রয়াসই টেকসই হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রকে তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হবে যাতে করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সমান মূল্য নিশ্চিত করা যায়। এখানে ‘আইনের শাসন’ কেবল একটি প্রশাসনিক নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, যা ছাড়া নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থা কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
তৃতীয়ত, সমাজকে তার নৈতিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা আর গ্রহণযোগ্য থাকবে না। কারণ নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ থাকে না; তা অনিবার্যভাবে অন্যায়ের পক্ষেই কাজ করে। নাগরিক সচেতনতা, নৈতিক সাহস, এবং সক্রিয় সামাজিক প্রতিরোধ- এই তিনটির সম্মিলনেই একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে, যেখানে মানুষের জীবন আর অবহেলার শিকার হবে না।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই ‘সিস্টেমিক’ ও ‘সিস্টেম্যাটিক’ সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কারণ এই মৃত্যু উপত্যকা কোনো বাইরের শক্তির তৈরি নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত কর্ম, নীরবতা এবং উদাসীনতারই ফল। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের ‘সামষ্টিক দায়’ (কালেক্টিভ রিসপন্সিবিলিটি), যেখানে অপরাধটি কেবল কিছু মানুষের নয়; বরং একটি সামগ্রিক নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। আমরা যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করি না, প্রশ্ন তুলি না, কিংবা নিজেকে দায়মুক্ত ভাবি, তখন নিজেদের অজান্তেই এই সহিংস কাঠামোটিকে টিকিয়ে রাখি। এই নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, আমাদের হয়তো আবারও ফিরে যেতে হয় সেই আত্মধিক্কারের গভীরতম উচ্চারণে, যা কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯–১৯৭৬) ভাষায়, ‘মনে হয়- ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি, ‘মা বসুধা দ্বিধা হও!/ ঘৃণাহত মাটি-মাখা ছেলেরে তোমার/ এ নির্লজ্জ মুখ-দেখা আলো হ’তে অন্ধকারে টেনে লও’! এই কাব্যিক আর্তনাদ কেবল ব্যক্তিগত বেদনার প্রকাশ নয়; এটি এক গভীর নৈতিক লজ্জা ও প্রতিবাদের ভাষা, যেখানে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। অতএব এই ধিক্কার কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র বা সমাজের প্রতি নয়; এটি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের প্রতি নিবেদিত এক আত্মসমালোচনা। কারণ সত্যটি যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা’ প্রকৃতপক্ষে আমাদেরই নির্মাণ, আমাদেরই অর্জন। এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়েই হয়তো শুরু হতে পারে পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ, যেখানে আমরা কেবল ভুক্তভোগী নই, বরং দায়-স্বীকারকারী এবং পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠি।

সবশেষে, প্রশ্নটি আর কেবল একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কিংবা কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আমাদের অস্তিত্বের গভীরে গিয়ে আঘাত হানে। আমরা কেমন সমাজ গড়ছি? আমরা কি এমন এক ভূখণ্ডে বাস করছি, যেখানে মানুষের জীবন নিরাপদ, নাকি এমন এক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, যেখানে মৃত্যু-ই হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের বাস্তবতা? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। কারণ প্রতিটি অনিরাপদ জীবন বা অপমৃত্যু আমাদের সম্মিলিত মানবিকতার ওপর একেকটি আঘাত, প্রতিটি অন্যায়-অবিচার আমাদের নৈতিক কাঠামোর ভাঙনের সাক্ষ্য। প্রতিটি অপমৃত্যুর সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া অপরিহার্য। অপরাধ দমনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। অতএব এই ‘মৃত্যু উপত্যকা’ থেকে উত্তরণের পথ শুরু হয় স্বীকারোক্তি থেকে অর্থাৎ আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা, উদাসীনতা ও নীরবতার দায় স্বীকার করার মধ্য দিয়ে। এর পরেই প্রয়োজন জাগ্রত বিবেক, সক্রিয় নাগরিকতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার। সাথে সাথে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা, সমাজকে তার নৈতিক ভিত্তিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, এবং ব্যক্তিকে তার মানবিক দায়বোধে উদ্দীপ্ত করা- এই ত্রিমাত্রিক রূপান্তর ছাড়া কোনো স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। নইলে ‘নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার’ কেবল একটি উচ্চারণ হয়েই থেকে যাবে, আর ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ বলে প্রত্যাখ্যানও একদিন নিছক বাগাড়ম্বর হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই এই ধিক্কারকে দায়বোধে, এবং এই প্রত্যাখ্যানকে পরিবর্তনের অঙ্গীকারে রূপ দিতে পারি, তবে হয়তো একদিন আমরা বলতে পারব, ‘এই দেশ মৃত্যু উপত্যকা নয়’; এটি এমন এক মানবিক ভূখণ্ড, যেখানে মানুষের জীবন শুধু টিকে থাকে না, মর্যাদার সঙ্গে বিকশিতও হয়। তখনই গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের (১৯২৫-১৯৮৬) মতই দেশবাসী মুগ্ধতায় সমবেত কন্ঠে গেয়ে উঠতে পারবে, ‘বিশ্ব কবির ‘সোনার বাংলা’,/ নজরুলের ‘বাংলাদেশ’,/ জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’/ রূপের যে তার নেই কো শেষ, বাংলাদেশ’।

* লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।



বিষয়: #  #  #



আর্কাইভ

---
সুনামগঞ্জে ধর্ষক সামছুল হককে পালিয়ে যেতে সহায়তার ঘটনায় অভিযোগ দায়ের
টেকনাফে কোস্টগার্ডের অভিযানে ইয়াবাসহ দুই মাদক পাচারকারী আটক
রাণীনগরে কৃষি কর্মকর্তাদের অবহেলায় ভেস্তে গেছে ক্লাস্টার এডব্লিউডি প্রযুক্তি প্রদর্শনী প্রকল্প
মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ
টেকনাফে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে বন্দি থাকা নারী ও শিশুসহ উদ্ধার ৭
সুন্দরবনের কুখ্যাত দস্যু জোনাব বাহিনীর কাছে জিম্মি থাকা জেলে উদ্ধার
সুনামগঞ্জ শহরে অগ্নিকান্ডে ১৮টি দোকান পুড়ে ছাইভস্ম : ১০ কোটি টাকার ক্ষতি
দৌলতপর সীমান্তে বিজিবির পৃথক অভিযানে ভারতীয় মালামাল সহ একজনকে আটক
মুন্সিগঞ্জে কোস্টগার্ডের অভিযানে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল জব্দ
সিলেটে-টাঙ্গাইলে প্রকৌশলী সিন্ডিকেট! ছাতক ও সিলেট বিউবো প্রকল্পে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার তামার তার লুট!
সুন্দরবনের দস্যু ছোট সুমন বাহিনীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে কোস্টগার্ড
রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ অনির্দিষ্টকালে জন্য বন্ধ
মায়ানমারে পাচারকালে ডিজেল আলুসহ ১০ জনকে আটক করেছে কোস্টগার্ড
মোংলায় কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে যৌথ অভিযানে ১২ হাজার ৬১৩ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ
পত্নীতলায় বজ্রপাতে নিহত ১, আহত ২
সংরক্ষিত আসনে আলোচনায় ঢাবি’র ‘মৌলভী আব্দুল মতিন স্বর্ণপদক’ প্রাপ্ত লিলি
আইপিএল উদ্বোধনী ম‍্যাচে ৬ উইকেটে বেঙ্গালুরুর সহজ জয়
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ৩ সাংবাদিক নিহত
আগামী ৫ দিন বৃষ্টির শঙ্কা, তীব্র হতে পারে গরমের দাপট
দৌলতপুর ফিলিপনগর কাচারিপাড়ায় গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে কৃষকের ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু পুড়ে ছাই
পলাতক আসামীদের সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ঘটনায় পাথারিয়ায় উত্তেজনা
সৌদিতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ১২ সেনা আহত
ঝিনাইদহে বজ্রপাতে দুই কৃষক নিহত, আহত ৪
রানা প্লাজার ‘বিদ্রোহী’ নাসিমার প্রাণ গেল দৌলতদিয়া বাস ডুবি দুর্ঘটনায়, পার্বতীপুরে শোক
দৌলতপুর সীমান্তে পৃথক তিনটি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক, ওষুধ এবং চোরাচালান পণ্যসহ দুই চোরাকারবারিকে আটক
দারুণ লড়াইয়ে ব্রাজিলকে হারাল ১০ জনের ফ্রান্স
রাজধানীতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, আটক ৫
ঢাকায় যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে অস্ত্রসহ দুই ‘শুটার’ গ্রেপ্তার
সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
রাণীনগরে জমির মালিকানা দ্বন্দ্বে মারপিটে পিতা-পুত্র আহত