শনিবার ● ২৯ নভেম্বর ২০২৫
প্রথম পাতা » আলোকিত ব্যক্তিত্ব » খ্যাতিমান গীতিকবি ও সাহিত্যস্রষ্টা এস.এম. শরীয়ত উল্লাহ : সৃজনশীলতার দীপ্ত প্রতিচ্ছবি
খ্যাতিমান গীতিকবি ও সাহিত্যস্রষ্টা এস.এম. শরীয়ত উল্লাহ : সৃজনশীলতার দীপ্ত প্রতিচ্ছবি
কবি ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি::
![]()
বাংলা সাহিত্য–সংগীত অঙ্গনে বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার ধারায় যে ক’জন ব্যক্তিত্ব নিজেদের এক অনন্য অবস্থান গড়ে তুলেছেন, কবি এস.এম. শরীয়ত উল্লাহ তাঁদের অন্যতম। গীত রচনা, কবিতা, গজল, উপন্যাস, জীবনী, গবেষণা—সব মিলিয়ে তাঁর বিস্তৃত সৃজনভুবন যেন এক ধারাবাহিক অনুসন্ধান, অনুশীলন ও আত্মমগ্ন সাধনার জ্যোতিষ্করূপ। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের খুরমা গ্রামে জন্ম নেওয়া এই সৃষ্টিশীল মানুষ বহু দশক ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে অবদান রেখে চলেছেন, তা আজ পরিণত হয়েছে বাংলা সংগীত–সাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদে।
এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাঁর জীবন, সৃষ্টিকর্ম, সংগীতচর্চা, সাহিত্যজগতে তাঁর অবস্থান, অবদান ও প্রভাব—সব মিলিয়ে এক অনুসন্ধানী ধারার বিশ্লেষণ। জন্ম, বেড়ে ওঠা ও মূল্যবোধের বীজসূত্র খুরমা গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীবেষ্টিত জনপদ, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির প্রবাহ—এসবই ছোটবেলা থেকেই প্রভাব ফেলেছে এস.এম. শরীয়ত উল্লাহর মনোজগতে। তাঁর পিতা মরহুম আইন উল্লাহ এবং মাতা মরহুমা কটুজা বেগম—উভয়েই ছিলেন নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিকতার অনুশীলনকারী। তাঁদের আদর্শ, পারিবারিক শাসন, সততা ও আত্মত্যাগের শিক্ষা থেকেই শরীয়ত উল্লাহ জীবনের প্রাথমিক অনুপ্রেরণা পেয়েছেন—এ তথ্য তাঁর ব্যক্তিগত সূত্রে জানা যায়।
সৃজনশীলতার উন্মেষধারা শুরু হয় কৈশোরে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্কুলের সাহিত্যচর্চা ও মসজিদের মাহফিল—সব জায়গাতেই তিনি লিখতেন, আবৃত্তি করতেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর শব্দজগত।
গীত রচনায় অভিষেক : জাতীয় স্বীকৃতির যাত্রা
কবি এস.এম. শরীয়ত উল্লাহর সৃজন জীবনের সবচেয়ে বিস্তৃত অধ্যায় তাঁর গীতরচনা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কাজ করছেন। সিলেট বিভাগীয় গীতিকার সংসদের উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর ভূমিকা সুপরিচিত। সুনামগঞ্জ জেলা গীতিকার ফোরামের সহ-সভাপতি ছাতক–দোয়ারা গীতকবি পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা
এই চারটি সংগঠনে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে সংগীতচর্চার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা গভীর।
নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা যায়—তিনি এখনও পর্যন্ত লিখেছেন—গান : ২০০০–২২০০টি,গজল : ৪৭০টি
গণসংগীত : ৫০টি,কবিতা : ৪০০টি,সংখ্যার দিক থেকে এটি এক বিশাল ভাণ্ডার হলেও আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো—বহু গানের মধ্যেই রয়েছে আধ্যাত্মিকতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, প্রেম-বিষাদ ও সামাজিক বোধের মিশ্রণ। তাঁর গানের ভাষা সহজ, শ্রুতিমধুর এবং মরমিয়া ধাঁচের, যা সুনামগঞ্জ–সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক সংগীতধারার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে সাহিত্যচর্চা : বহুমাত্রিক লেখক পরিচয়ের উন্মোচন
এস.এম. শরীয়ত উল্লাহ শুধু গীতিকার নন—তিনি পূর্ণাঙ্গ একজন সাহিত্যিক। এপর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ১৩টি, এগুলোর পর্যালোচনা করলে তাঁর লেখালেখির বিস্তৃত ক্ষেত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
১. আধ্যাত্মিক জীবনীগ্রন্থ দরবেশ শাহজালাল (রহ.) — জীবনী হযরত শাহপরান (রহ.) — জীবনী
সুফি সাধক শিতালং শাহ — সম্পাদিত,সিলেট অঞ্চলের আধ্যাত্মিক অঙ্গনের প্রধান তিন ব্যক্তিত্বের ওপর তাঁর গবেষণাধর্মী লেখাগুলো পাঠকসমাজে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
গবেষণামূলক তথ্য, ঐতিহাসিক দলিল ও আঞ্চলিক লোকবিশ্বাস—এসবের সমন্বয় তাঁর জীবনীগ্রন্থগুলোতে সমৃদ্ধভাবে ফুটে উঠেছে।
২–৩. উপন্যাস : হ্রদয়ে তুমি, জলন্ত প্রেম
উপন্যাসে তিনি প্রেম, সমাজবাস্তবতা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে তুলে ধরেছেন। ভাষা সহজ, দৃশ্যবর্ণনা সাবলীল এবং চরিত্রগুলো বাস্তবধর্মী। ৪. গজলগ্রন্থ : মদিনার ফুল (১ম–৩য় খণ্ড) তিন খণ্ডে প্রকাশিত এই গজলগ্রন্থ তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে সবচেয়ে প্রশংসিত। গজলের ছন্দ, বৈরাগ্য, হিজরত-অনুভূতি ও মরমিয়া সুরধারার অনন্য সমন্বয়ই তাঁর গজলকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
৫. সংগীত ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রতিভা – সংগীত (সম্পাদিত) মাটির সারিন্দা – সংগীত (সম্পাদিত)
ইসলামী সংগীত (গজল) ঝলক (শানে ফুলতলী)
এসব গ্রন্থের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন গীতিকার, তরুণ স্রষ্টা ও দেশীয় সংগীতধারাকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
তাছাড়া ৯টি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় আছে—যা তাঁর সৃজনশীল উৎপাদনশীলতা কতটা প্রবাহমান, তা স্পষ্ট করে।
শিক্ষাজীবন ও চাকরি : শিক্ষকতার মাটিতে গড়ে ওঠা সৃষ্টিশীলতা তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় প্রাইমারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা তাঁকে দিয়েছে—
মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা
ভাষা ব্যবহারের সাবলীলতা শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ত্ব বোঝার সুযোগ সামাজিক বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের অভ্যাস এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর সাহিত্যকর্মে স্পষ্ট প্রতিফলিত।
বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত, তবে সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর ব্যস্ততা এখনো অটুট।
সংগীত-সাহিত্যচর্চায় তাঁর অবদান : অনুসন্ধানী পর্যালোচনা ১. আঞ্চলিক সংগীতধারায় অবদান
সিলেট অঞ্চলের ফোক ও মরমিয়া ধারা বহুদিন ধরেই শক্তিশালী হলেও সুনির্দিষ্ট গীতিকারের অভাবে অনেক সময় তা কাঠামোবদ্ধ রূপ পায়নি। শরীয়ত উল্লাহ তাঁর লেখনির মাধ্যমে—গানের ভাষা পেশাদারিত্ব দিয়েছে লোকসঙ্গীতকেনান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন তরুণ শিল্পীদের নতুন গানের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন। ২. ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভূমিকা,শাহজালাল–শাহপরান সংক্রান্ত তাঁর জীবনীগ্রন্থগুলো গবেষকদের জন্য মূল্যবান সূত্র হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। ৩. নতুন প্রজন্মের সংগীতকর্মীদের অনুপ্রেরণা তাঁর গান বহু নবীন শিল্পী ও গীতিকার পরিবেশন করেছেন। অনেক তরুণ গীতিকার তাঁর সংস্পর্শ ও পরামর্শকে পথনির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করেন।
৪. সাহিত্যে বিষয়বৈচিত্র্য তিনি লিখেছেন—
প্রেম আধ্যাত্মিকতা,ইতিহাস সামাজিক সংকট
গণসংগীত জাতীয় চেতনা এ বৈচিত্র্য তাঁকে একজন বহুমাত্রিক সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্যক্তিজীবন : স্থিরতা, অনুপ্রেরণা ও সৃষ্টিশীলতার পরিবেশ ব্যস্ত সৃজনজীবনের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন একটি হাসিখুশি পরিবার। স্ত্রী, তিন পুত্র ও এক কন্যাকে নিয়ে তাঁর পরিবার—এই স্থিরতা ও বন্ধনই তাঁকে সৃষ্টিশীলতার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ দিয়েছে। তাঁর ভাষায়—“পরিবার আমার শক্তি, আর শব্দ আমার আশ্রয়।
পরিবারের এই সহযোগিতা দীর্ঘ সাহিত্যভ্রমণে তাঁকে অবিচল রেখেছে। সমসাময়িক গীতিকার সমাজে তাঁর অবস্থান বাংলাদেশে গীতিকারদের সংখ্যা বাড়লেও ধারাবাহিকভাবে ২০০০–২২০০ গান লেখা স্বাভাবিক নয়। এই পরিসংখ্যান নিজেই প্রমাণ করে তাঁর—শ্রমঘন লেখনী,দীর্ঘমেয়াদি চর্চা
পেশাদার মনোভাব,এবং অদম্য সৃজনস্পৃহা
গীতিকার হিসেবে তিনি দেশের সংগীত অঙ্গনে অন্যতম অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। সিলেট বিভাগের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর মতামত এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
অনুসন্ধানী প্রশ্ন : কেন তিনি বিশেষ? এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ পায়—১. সংখ্যায় নয়—ধারণায় তিনি ব্যতিক্রমী তিনি শুধু গান লিখেন না; প্রতিটি গানে থাকে বিশেষ একটি দর্শন, বার্তা বা অনুভূতি।
২. আধ্যাত্মিকতার ধারাকে আধুনিক রূপ দিয়েছেন
তাঁর গজলে রয়েছে ধর্মীয় ভাবগম্ভীরতা, কিন্তু ভাষা আধুনিক—যা তরুণদেরও আকর্ষণ করে।
৩. সামাজিক–সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব বিভিন্ন গীতিকার সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা একটি সাংস্কৃতিক সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। ৪. গবেষণা, সাহিত্য ও সংগীত—সব ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতা
এ তিনটি ক্ষেত্র সচরাচর এক ব্যক্তির মধ্যে একইভাবে বিকশিত হয় না। শরীয়ত উল্লাহ সেই বিরল ব্যতিক্রম।
বাংলা সাহিত্য–সংগীত অঙ্গনে ভবিষ্যৎ প্রভাব
অনুসন্ধানে দেখা যায়—তাঁর কাজগুলো শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ শিল্পী-লেখকদের জন্যও এক অনুপ্রেরণার ভাণ্ডার।
তাঁর সংগৃহীত গজল,জীবনী গবেষণা,লোকগীতি পুনর্গঠন,আধ্যাত্মিক সাহিত্য,এসবই নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়।গবেষকরা মনে করেন—সিলেট অঞ্চলে সংগীত ও সাহিত্যচর্চায় তাঁর প্রভাব আগামী দশকেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
এক দীপ্ত সৃজনশীল প্রতিচ্ছবি গান–গজল–কবিতা–উপন্যাস–জীবনী—প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান পারদর্শিতা দেখিয়ে এস.এম. শরীয়ত উল্লাহ বাংলা সাহিত্য–সংগীত অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর পরিশ্রম, নীরব সাধনা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার সমন্বয় তাঁকে অনন্য করেছে।
সর্বোপরি বলা যায়—বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি স্মরণীয়–উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকবেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম অমূল্য সম্পদ হয়ে পাঠক–শ্রোতার হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবে।
বিষয়: #উল্লাহ #খ্যাতিমান #গীতিকবি #দীপ্ত #প্রতিচ্ছবি #শরীয়ত #সাহিত্যস্রষ্টা #সৃজনশীলতার




ভ্রমণকার শাকুর মজিদ বহুমাত্রিক সত্তার জন্মদিনে সৃষ্টিশীলতার মহোৎসব !
স্মরণে সাংবাদিকতার প্রথিক জেড এম শামসুল: সাদাসিধে জীবনে আলোর দিশারী
ফকির দুর্ব্বিন শাহ: ভাটি বাংলার মরমি বাউল সাধক
ড. আজিজুল আম্বিয়া পেলেন “গ্লোবাল প্রপার্টিজ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড 2025″
মাহরিন চৌধুরী: সোনার হরফে লেখা অনন্য শিক্ষকের নাম
“বিশিষ্ট সমাজসেবক, আলহাজ্ব জয়নাল হোসেন এর মৃত্যুতে একাটুনা ইউনিয়ন ফাউন্ডেশন অব মৌলভীবাজার এর শোক প্রকাশ;
অনুষ্ঠিত হয়েছে সদ্য প্রয়াত সিলেটের বিশিষ্ট কবি মুকুল চৌধুরী ও প্রাবন্ধিক সিরাজুল হক স্মরণে স্মরণ সভা।
লোকসংস্কৃতি গবেষক আবু সালেহ আহমদ এর ধারাবাহিক গ্রন্থ আলোচনা-০৩ ভালোবাসার বহিরাবরণ: গ্রন্থটি সমাজ, প্রেম ও মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি..। আলোচক- কবি এম আর ঠাকুর।
মৌলভীবাজারের কবি, লেখক, সাংবাদিক সৌমিত্র দেবের স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত
