শনিবার ● ৭ মার্চ ২০২৬
প্রথম পাতা » বিশেষ » কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী : বহুভাষার আলোকবর্তিকা নিভে গেল
কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী : বহুভাষার আলোকবর্তিকা নিভে গেল
আনোয়ার হোসেন রনি::
কবি, গবেষক, ভাষাতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, গীতিকার, সুরকার ও সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান নিজামী আজ আর আমাদের মাঝে নেই।
বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে আরেকটি নক্ষত্র নিভে গেল।
রংপুরে একটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর। তার মৃত্যুতে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) সকালে রংপুরে অসুস্থ হয়ে পড়লে সহকর্মীরা দ্রুত তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ছোট ভাই কাউখালী প্রেস ক্লাবের সভাপতি আরিফুল হক মাহবুব।
একজন মানুষ একই সঙ্গে কবি, গবেষক, ভাষাবিদ, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে এত বিস্তৃত অবদান রেখে যেতে পারেন—মাহমুদুল হাসান নিজামী ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। তার জীবন ছিল সৃজন, সাধনা ও জ্ঞানচর্চার এক দীর্ঘ অধ্যায়।
জন্ম ও শৈশব
১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার কালাপানিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মাহমুদুল হাসান নিজামী। তার বাবা মরহুম মাওলানা আবদুল্লাহ ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মা মরহুমা মায়মুনা খাতুন ছিলেন একজন স্নেহময়ী গৃহিণী।
ধর্মীয় ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিজামীর মধ্যে ছোটবেলা থেকেই জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যপ্রেমের বীজ রোপিত হয়। স্কুলজীবন থেকেই তিনি কবিতা লিখতেন, বই পড়তেন এবং ভাষা শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখাতেন।
পরবর্তীতে জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেছেন। যদিও জন্ম চট্টগ্রামে, তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার সদর এলাকায়। এখানেই গড়ে ওঠে তার সাহিত্যিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র।
বহুভাষাবিদ এক অনন্য মানুষ বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে মাহমুদুল হাসান নিজামীকে অনন্য করে তুলেছিল তার বহুভাষাজ্ঞান। আরবি, ফার্সি, উর্দু ও ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় তার গভীর দখল ছিল। বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী কবিদের প্রতি তার ছিল বিশেষ অনুরাগ। তিনি শেখ সাদী, ফরিদ উদ্দিন আত্তার এবং প্রাচীন আরব কবি ইমরুল কায়েসের কবিতার বাংলা কাব্যানুবাদ করেন। গবেষকদের মতে, বাংলা ভাষায় এ ধরনের কাব্যানুবাদের পথিকৃৎদের অন্যতম ছিলেন তিনি।
বাংলা ভাষায় বিদেশি ধ্রুপদী কবিতার রস ও দর্শন তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার কাজ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অনেক সাহিত্য সমালোচকের মতে, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পর এত বিস্তৃত ভাষাজ্ঞান ও অনুবাদসাধনায় নিজামীর মতো মানুষ পাওয়া সত্যিই বিরল।
সাহিত্যজীবনের বিস্তৃতি মাহমুদুল হাসান নিজামীর সাহিত্যজীবন ছিল বিস্ময়করভাবে সমৃদ্ধ। তার লেখা কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদ মিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৪০টি। এছাড়া তিনি পাঁচ হাজারেরও বেশি কবিতা ও গান রচনা করেছেন।
তার লেখার বিষয়বস্তু ছিল বৈচিত্র্যময়। প্রেম, প্রকৃতি, ইতিহাস, দর্শন, মানবতা, সমাজের অসঙ্গতি—সবকিছুই তার লেখনীতে উঠে এসেছে এক অনন্য ভাষাশৈলীতে। নিজামীর কবিতায় শব্দের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সুনিপুণ। তিনি শব্দকে কেবল ভাষার উপাদান হিসেবে নয়, বরং ভাব ও দর্শনের বাহন হিসেবে ব্যবহার করতেন। ফলে তার কবিতা পাঠকের কাছে শুধু নান্দনিক অভিজ্ঞতা নয়, বরং চিন্তারও খোরাক জোগায়।
কবিতার ভুবনে নিজস্ব স্বর কবি মাহমুদুল হাসান নিজামীর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তার দার্শনিক গভীরতা। তার কবিতায় মানবজীবনের আনন্দ-বেদনা, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, প্রতিবাদ এবং মানবতার আহ্বান একসঙ্গে ধ্বনিত হয়েছে।
তার কাব্যে প্রকৃতি এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। নদী, পাহাড়, সমুদ্র, আকাশ—এসব উপমা ও রূপক তার কবিতাকে দিয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য।
সমালোচকদের মতে, তার কবিতা একই সঙ্গে ধ্রুপদী ও আধুনিক। ভাষার অলংকার, ছন্দের বৈচিত্র্য এবং ভাবের গভীরতায় তার কবিতা বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কেবল লেখক হিসেবেই নয়, একজন সংগঠক হিসেবেও মাহমুদুল হাসান নিজামী ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়।
তিনি জাতীয় কবিতা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কবিতা চর্চা ও সাহিত্য আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এছাড়া তিনি জাতীয় সাংবাদিক মঞ্চের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—দুটি ক্ষেত্রেই তিনি সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন।
সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা মাহমুদুল হাসান নিজামী দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দৈনিক ডেসটিনি এবং দৈনিক দেশজগত পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার লেখালেখি ও সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামনে নিয়ে আসেন। সাংবাদিক হিসেবে তিনি ছিলেন সাহসী ও অনুসন্ধানী।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান নিজ এলাকার উন্নয়নে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। কাউখালী এলাকায় স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠায় তার অবদান রয়েছে। স্থানীয় মানুষ তাকে শুধু কবি বা সাংবাদিক হিসেবে নয়, বরং একজনসমাজসেবক হিসেবেও শ্রদ্ধা করতেন।
২০২৫ সালে অক্টোবর মাসে কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী ঢাকাস্থল বাসায় আমার সঙ্গে ঘন্টাব্যপি আলাপ আলোচনা,লেখালেখি নিয়ে চায়ে আড্ডায় তার নিজের লেখা একটি বই আমাকে উপহার দেন। আমার হাতে লেখা সৈয়দবাড়ির বাতিঘরটি তার হাতে তুলে দেয়ার সময় জোর করে একটি ছবি তোলা হয়। এসময় আরো দুজন সংবাদকমী আমার সঙ্গে ছিলেন। তিনজন মিলে সকালে নাস্তা
কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী ভাই এর বাসা খাই। সেসময় বাববার কবি আমাকে বলছেন তুমি আমাকে মোবাইলে কল দেবে কিন্তু। ঢাকা থেকে আসার পর একাধিক বার তার সঙ্গে কবিতা বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করা হয়। তার মৃত্যু সংবাদটা আমাকে আঘাত করছে। মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে আমার।
মৃত্যুতে শোকের ছায়া
কবি মাহমুদুল হাসান নিজামীর মৃত্যুতে দেশের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই আবেগঘন বার্তায় তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালেদ হোসাইনসহ বিভিন্ন মহল তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
সাহিত্যাঙ্গনের অনেকেই মনে করেন, তার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য এক নিবেদিতপ্রাণ সাধককে হারাল।
জানাজা ও দাফন পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কবি মাহমুদুল হাসান নিজামীর প্রথম জানাজা শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার বাংলা একাডেমি অথবা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলায় এবং তৃতীয় জানাজা হবে চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায়। সবশেষে কাউখালী কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তার পিতা-মাতার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
সাহিত্যচর্চার এক নিবেদিত জীবন সাহিত্য এমন এক সাধনা, যা কেবল প্রতিভা দিয়ে নয়, বরং ধৈর্য, অধ্যবসায় ও গভীর জীবনবোধ দিয়ে অর্জন করতে হয়। মাহমুদুল হাসান নিজামী সেই বিরল সাহিত্যিকদের একজন, যিনি জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই সাহিত্যচর্চায় উৎসর্গ করেছিলেন।
তার প্রতিটি কবিতায় জীবনের নানা রূপ ধরা পড়ে। কখনো প্রেম, কখনো বেদনা, কখনো প্রতিবাদ—আবার কখনো মানবতার আবেদন।
এই বৈচিত্র্যই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
এক আলোকবর্তিকার বিদায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বহু কবি এসেছেন, আবার চলে গেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকেন। মাহমুদুল হাসান নিজামী তেমনই একজন মানুষ। তার কবিতা, অনুবাদ, গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তার শব্দ, তার চিন্তা, তার সাহিত্যিক সাধনা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে চিরকাল জ্বলতে থাকবে এক উজ্জ্বল আলোর মতো।
কবি মাহমুদুল হাসান নিজামীর বিদায়ে বাংলা সাহিত্য হারাল এক নিবেদিতপ্রাণ সাধককে। তার সৃষ্টি, তার স্বপ্ন এবং তার মানবিক দর্শন নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা।
কবি ও সাংবাদিক :: আনোয়ার হোসেন রনি
বিষয়: #আনোয়ার #কবি #রনি #সাংবাদিক #হোসেন










স্বাধীনতা পদক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা: চেনা ব্রাহ্মণের পৈতা লাগে না
“দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী সাহিত্য পদক ২০২৬” পাচ্ছেন রফিকুর রশীদ ও আকিমুন রহমান
সিলেটে ‘অদম্য নারী সম্মাননা–২০২৫: পাঁচ ক্যাটাগরিতে পাঁচজনের স্বীকৃতি।
ইরানে ‘কঠোর আঘাত’ এখনো করিনি, ‘মূল আক্রমণ শিগগিরই’: ট্রাম্প
আধিপত্যবাদের নগ্নরূপ: আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন!
রমজানে প্রস্রাবের যন্ত্রণা কেন হয়, করণীয় কী?
সাহরিতে পেঁপে দিয়ে গরুর মাংস রান্নার রেসিপি
হবিগঞ্জের উদ্যমী তরুণ সাংবাদিক সৈয়দ রাশিদুল হক রুজেন এর চলচ্চিত্র ” ভাটি দেশের কইন্যা ” আন কাট সেন্সর পেল। 