মঙ্গলবার ● ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
প্রথম পাতা » বিশেষ » ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রত্যাশা
ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রত্যাশা
ড. আজিজুল আম্বিয়া ::
![]()
বাংলাদেশ আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নির্বাচনোত্তর বাস্তবতায় নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, নতুন বিরোধী দল সংসদে বসেছে, আর জনগণ তাকিয়ে আছে একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ক্ষমতার নয়, বরং নীতির। রাষ্ট্র কোন পথে হাঁটবে? প্রতিহিংসা না ন্যায়বিচার? প্রভাব না আইনের শাসন?
গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি গড়ে ওঠে তখনই, যখন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া হয় প্রভাবমুক্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক বিরোধ, মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার কারণে অসংখ্য মানুষ মামলার জালে জড়িয়েছেন। বিশেষ করে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় সাংবাদিকদের আটক হওয়ার ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। সংবাদমাধ্যম যদি ভয়ের মধ্যে কাজ করে, তবে জনগণ অন্ধকারেই থাকে। একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কেবল সরকারের সমালোচনা করে না, বরং ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।
সাংবাদিকদের জন্য আইনি সুরক্ষা, ন্যায়সঙ্গত বিচার এবং জামিনের অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ নেই, তাদের দীর্ঘদিন আটক রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। বিচার হবে, কিন্তু তা হতে হবে আইনের কাঠামোর ভেতরে, প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে। নতুন সরকারের শুরু হোক এই অঙ্গীকার দিয়ে যে বিচারব্যবস্থা হবে স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া-কে স্বাগত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-কেও স্বাগত। সরকার ও বিরোধী দল, উভয়ের ভূমিকা গণতন্ত্রে অপরিহার্য। এক পক্ষ শাসন করবে, অন্য পক্ষ সমালোচনা করবে, তদারকি করবে, বিকল্প প্রস্তাব দেবে। এই ভারসাম্যই গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় অধ্যায় জুড়ে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্ব। তাঁর হাত ধরেই দেশ স্বাধীনতার পথে এগিয়েছে। আজ যদি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশে না থাকেন, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করা। অপরাধী হলে অবশ্যই বিচার হবে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কারও নাগরিক অধিকার খর্ব করা চলতে পারে না। একটি পরিণত রাষ্ট্র প্রতিপক্ষকে দমন করে নয়, বরং আইনের কাঠামোর ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান-এর উত্তরাধিকার বহনকারী নেতৃত্বের কাছেও জনগণের প্রত্যাশা অনেক। স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল গৌরবের স্মৃতি নয়, এটি দায়িত্বেরও স্মারক। স্বাধীনতাবিরোধী, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ শক্তিকে প্রশ্রয় দিলে সেই ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হবে।
আজ দেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। মব সন্ত্রাস একটি ভয়ংকর প্রবণতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গুজব বা সন্দেহের ভিত্তিতে গণপিটুনি সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়। একইভাবে নারী ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এসব অপরাধের বিচার দ্রুত ও দৃশ্যমান না হলে অপরাধীরা উৎসাহ পায়। সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে অপরাধের কোনো দলীয় রঙ নেই।
আরও একটি কঠিন বাস্তবতা হলো দলীয় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি। ক্ষমতায় আসার পর অনেক সময় দলের কিছু কর্মী নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে। এই সংস্কৃতি বন্ধ না করলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। নিজেদের ঘর থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে না পারলে নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজ যেই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও কম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বিতর্ক, ব্যাংক খাতে অনিয়ম, অর্থপাচারের অভিযোগ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষকে বিপর্যস্ত করেছে। বাজারদর নিয়ন্ত্রণ এখন কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের বাইরে গেলে জনগণের আস্থা নড়ে যায়।
অর্থপাচার, দুর্নীতি ও রিজার্ভ অর্থের অপব্যবহার নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অভিযোগ যত বড়ই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হতে হবে। গত দুই বছরে যারা দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থা না হলে ন্যায়বিচারের দাবিটি অর্থহীন হয়ে যাবে। একইভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে যারা সহিংসতায় জড়িয়েছে, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে যুক্ত, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সংস্কার জরুরি। পরিবার কার্ড ও চিকিৎসা কার্ড পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা দিলে তাদের জীবনের অনিশ্চয়তা কমে। উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না; মানুষের জীবনে স্বস্তি এলে তবেই উন্নয়ন অর্থবহ হয়।
দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসের অভিজ্ঞতা নতুন নেতৃত্বকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সেবামুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে বলেই আশা করা যায়। আইন মানুষের জন্য, মানুষের বিপক্ষে নয়। একটি কার্যকর মন্ত্রিসভা, দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে দ্রুত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো। প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সংসদে তর্ক হবে, সমালোচনা হবে, কিন্তু রাস্তায় সহিংসতা নয়। বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, আবার বিরোধী দল যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করে, তবুও গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উভয় পক্ষকেই পরিণত আচরণ দেখাতে হবে।
সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা রাষ্ট্রের সমালোচক, আবার পরামর্শদাতাও। তাদের কণ্ঠরোধ নয়, বরং যুক্তিসংগত সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে রাষ্ট্রকে দুর্বল করা নয়; বরং এটিই রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা দ্রুত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারি তার ওপর। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, সামাজিক সুরক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা—এই ছয়টি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে নতুন বাংলাদেশ।
জনগণ প্রতিশোধ চায় না, চায় সুবিচার। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে আইন সবার জন্য সমান; যেখানে সাংবাদিক ভয়ে নয়, দায়িত্ববোধে কলম ধরবেন; যেখানে বিরোধী দল সংসদে কথা বলবে, রাস্তায় সংঘাতে জড়াবে না; যেখানে দুর্নীতিবাজরা প্রভাবের কারণে নয়, অপরাধের কারণে বিচারের মুখোমুখি হবে।
নতুন সরকারের সামনে তাই সুযোগও আছে, চ্যালেঞ্জও আছে। ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া যায় দুইভাবে—ক্ষমতার দাপটে অথবা ন্যায়ের দৃঢ়তায়। সময় বলে দেবে কোন পথ বেছে নেওয়া হলো। তবে জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট: বাংলাদেশ হোক ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল এবং আইনের শাসনে পরিচালিত একটি আধুনিক রাষ্ট্র।
ড. আজিজুল আম্বিয়া, কলাম লেখক ও গবেষক
বিষয়: #আজিজুল #আম্বিয়া #কলাম #গবেষক #লেখক










সিলেটের ফুটপাত সংকটের স্থায়ী সমাধানে লন্ডনের আদলে ‘স্ট্রিট মার্কেট’ মডেলের প্রস্তাব সৈয়দ মিজানের!
ঢাকার আকাশে ভিন্ন এক দৃশ্য, চোখ ফেরাতে পারছেন না কেউ
জনগণের অর্থ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের চিকিৎসা বিতর্ক: রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের লন্ডন সফরের ভেতরের খবর
উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত: রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব
দেখে কিছু বুঝি নাই, চেখে পেলাম রসের সাগর
র্যাকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ এক বছরে ব্র্যাকের সেবা পেয়েছেন ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ
কেন ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির ভরাডুবি হচ্ছে?
অভিবাসন ও অভিবাসীদের বিষয়ে তাঁর নীতিসমূহ
বিপদসীমায় সুতাং: মাছের পেটে প্লাস্টিক, জনস্বাস্থ্যে চরম ঝুঁকি
কুমিরের পিঠে চড়ে ’সাধু বাবুর’ বাংলা জয়! 