শিরোনাম:
ঢাকা, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বজ্রকণ্ঠ "সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা", ঢাকা,নিউ ইয়র্ক,লন্ডন থেকে প্রকাশিত। লিখতে পারেন আপনিও। বজ্রকণ্ঠ:” সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা ” আপনাকে স্বাগতম। বজ্রকণ্ঠ:: জ্ঞানের ঘর:: সংবাদপত্র কে বলা হয় জ্ঞানের ঘর। প্রিয় পাঠক, আপনিও ” বজ্রকণ্ঠ ” অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ” বজ্রকণ্ঠ:” সময়ের সাহসী অনলাইন পত্রিকা ” কে জানাতে ই-মেইল করুন-ই-মেইল:: [email protected] - ধন্যবাদ, সৈয়দ আখতারুজ্জামান মিজান

Bojrokontho
বৃহস্পতিবার ● ১ জানুয়ারী ২০২৬
প্রথম পাতা » বিশেষ » বেগম খালেদা জিয়া: বাংলাদেশ প্রশ্নে আপোষহীন নেত্রী
প্রথম পাতা » বিশেষ » বেগম খালেদা জিয়া: বাংলাদেশ প্রশ্নে আপোষহীন নেত্রী
৪৮ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ১ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

বেগম খালেদা জিয়া: বাংলাদেশ প্রশ্নে আপোষহীন নেত্রী

ড. মাহরুফ চৌধুরী ::
ড. মাহরুফ চৌধুরী - বেগম খালেদা জিয়া: বাংলাদেশ প্রশ্নে আপোষহীন নেত্রী
বেগম খালেদা জিয়ার (১৯৪৫–২০২৫) রাজনৈতিক জীবনের সূচনা কোনো পূর্বপরিকল্পিত ক্ষমতা লাভের অভিলাষ বা ব্যক্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল নয়; বরং তা জন্ম নিয়েছিল এক রক্তাক্ত ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও জাতীয় সংকটের ধারাবাহিকতা থেকে। ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ এক গভীর শোক, রাজনৈতিক শূন্যতা ও অনিশ্চয়তার ভেতর প্রবেশ করে। সে সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল জনগণের হাতছাড়া, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল প্রায় অকার্যকর, আর রাজনীতি বন্দী ছিল সামরিক শাসনের কঠোর ছায়ায়। এমন এক দুঃসময়েই বেগম খালেদা জিয়া দেশের মূলধারার রাজনীতির সম্মুখসারিতে আবির্ভূত হন। সেটা মূলত ক্ষমতার মোহে নয়, বরং একটি আদর্শিক উত্তরাধিকার রক্ষা ও রাষ্ট্রকে পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর রাজনৈতিক অভিযাত্রা ছিল ব্যক্তিগত শোককে জাতীয় সংগ্রামে রূপান্তরের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবারের (১৮৬৪-১৯২০) ভাষায় যাকে ‘দায়িত্ববোধ’ (সেন্স অব রিসপন্সিবিলিটি) বলা যায়। এ দায়িত্ববোধ ক্ষমতার প্রতি নয়, বরং ইতিহাস ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা আর সেই নৈতিক দায়বোধই তাঁকে রাজনীতিতে অনড় অবস্থানে দাঁড় করায়। শুরু থেকেই তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার; যে অধিকার সামরিক শাসন ও পরাশক্তিনির্ভরতার রাজনীতিতে ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছিল।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্ব গ্রহণের পর তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানই হননি; বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে পরিণত হন এক প্রতীকী শক্তিতে। দলীয় সংগঠনকে পুনর্গঠন, মাঠপর্যায়ের রাজনীতিকে সক্রিয় করা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ব্যক্তি-নির্ভরতা থেকে আদর্শ-নির্ভরতার দিকে নেওয়ার প্রচেষ্টাই হয়ে ওঠে তাঁর নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই সময় থেকেই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয় একটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে আর সেটা হলো, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ, আর সেই জনগণের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় কোনো আপোষ নয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী (১৯৯১–১৯৯৬) হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি ছিলেন প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী যা কেবল এক মাইলফলকই নয়, বরং সামরিক শাসন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রতীকও বটে। এই সময় থেকেই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান সুস্পষ্ট ও সুসংহত রূপ পেতে শুরু করে। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে তিনি একটি মৌলিক বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন যে, বাংলাদেশ কারও করুণায় চলবে না, কোনো আঞ্চলিক বা পরাশক্তির ছায়াতলে নিজেকে সমর্পণ করবে না।
সভা-সমাবেশে তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনের নীতিগত অবস্থানে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্ব অবশ্যই হবে, আর তা হতে হবে ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে; সহযোগিতা থাকবে, তবে তা হবে পারস্পরিক স্বার্থের আলোকে। কিন্তু ক্ষমতা বা আয়তনে ছোট-বড় কারো পক্ষ থেকে আধিপত্য কখনোই বাংলাদেশের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে যাকে ‘সার্বভৌম সমতা’ (সোভরিন ইকুয়ালিটি) বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়া সেই নীতিকেই দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় রাজনৈতিক ভাষা দেন। তাই তিনি আধিপত্যবাদী শক্তির পদলেহী শাসক শ্রেণীকে লক্ষ্য করে সুস্পষ্ট করে বলতে পেরেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের কোন চক্রান্তই বাস্তবায়িত হতে দেব না’। ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদা যে বড় রাষ্ট্রের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না, এই উপলব্ধিই তাঁর পররাষ্ট্র ভাবনার কেন্দ্রস্থলে ছিল। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রশ্নে এই অবস্থান তাঁকে সমসাময়িক বহু রাজনীতিকের কাছ থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। তিনি প্রকাশ্যেই সতর্ক করে দেন যে, ভৌগোলিক নৈকট্য কখনোই রাজনৈতিক অধীনতার লাইসেন্স হতে পারে না। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন, অসম শক্তির সম্পর্কে বন্ধুত্ব যদি নীতির বদলে সুবিধাভিত্তিক হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত সার্বভৌমত্বকে ভূলুন্ঠিত করে। ফলে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে নিজের স্বার্থ, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সামনে রেখে কথা বলার সাহস অর্জন করে। এই সাহসই তাঁকে জনগণের চোখে কেবল একজন প্রধানমন্ত্রী নয়, বরং আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনীতির এক দৃশ্যমান কণ্ঠস্বর হিসেবে চিহ্নিত ও প্রতিষ্ঠিত করে। গণমানুষের মনে তাই তিনি হয়ে ওঠেছিলেন দেশনেত্রী।
পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে তাঁর দ্বিতীয় দফা শাসনামলে (২০০১–২০০৬) এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া বারবার সিকিমের উদাহরণ টেনে একটি গভীর ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল স্পষ্ট: ইতিহাস অসতর্ক জাতিকে ক্ষমা করে না। বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যের নীলনকসা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় তাঁর এই তুলনা ছিল নিছক আবেগী বক্তব্য নয়; বরং উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে নেওয়া এক সচেতন রাজনৈতিক পাঠ। সিকিমের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে ছিল একটি প্রতীক যেখানে ভারত ধাপে ধাপে বন্ধুত্ব, নিরাপত্তা ও সহযোগিতার নামে একটি রাষ্ট্রের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজনৈতিক সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে দেয়। এই প্রসঙ্গে তিনি কেবল ভারতীয় আগ্রাসী রাষ্ট্রনীতির সমালোচনাই করেননি, বরং বাংলাদেশি সমাজ, রাজনীতি ও নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে একটি স্পষ্ট সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন যে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সামান্য অসতর্কতাও ভবিষ্যতে জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ইতিহাসচর্চার ভাষায় যাকে ‘সার্বভৌমত্বের ক্রমবর্ধমান ক্ষতি’ (ইনক্রিমেন্টাল লস অব সোভরিন্টি) বলা যায়, বেগম খালেদা জিয়া সেই প্রক্রিয়াটিকেই গণমানুষের ভাষায় তুলে ধরতে চেয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষও ক্ষমতার সূক্ষ্ম স্খলনগুলো ধরতে ও বুঝতে পারে; হয়ে ওঠতে পারে সচেতন ও প্রতিবাদী।
তাঁর বক্তব্যে ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রসঙ্গ কখনো রূপক ও ইঙ্গিতপূর্ণ, কখনো আবার সরাসরি ও স্পষ্ট ভাষায় উপস্থিত ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, আঞ্চলিক শক্তির তথাকথিত ‘বন্ধুত্বের’ আড়ালে আবডালে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপকে চিহ্নিত ও উন্মোচন করা একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের নৈতিক দায়িত্ব। অ্যান্টোনিও গ্রামশির (১৮৯১-১৯৩৭) ভাষায়, আধিপত্য কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমে নয়, সম্মতি ও স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়; এই উপলব্ধিই ছিল তাঁর রাজনৈতিক সতর্কতার ভিত্তি। ফলে তাঁর অবস্থান ছিল দ্ব্যর্থহীন তথা নীরবতা নয়, স্পষ্টতা; আপোষ নয়, সচেতন প্রতিরোধ। এই দৃঢ়তাই তাঁকে ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক, সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে একটি অবিচল কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ক্ষমতার বাইরে থাকা দীর্ঘ সময়জুড়ে, বিশেষ করে একের পর এক রাজনৈতিক দমন–পীড়ন, মামলা, কারাবাস এবং পরিকল্পিত চিকিৎসা-বঞ্চনার মধ্যেও দৃঢ়চেতা দেশপ্রেমী বেগম খালেদা জিয়া দেশত্যাগে অস্বীকৃতি জানান। এই সিদ্ধান্ত ছিল কোনো কৌশলগত নীরবতা নয়, বরং সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তথা তার বিশ্বাস ও ভালোবাসার ভিত্তিতে দেশ ও মানুষের পক্ষে অবস্থান। তাইতো তাঁর বলিষ্ঠ সুস্পষ্ট উচ্চারণ, ‘বাংলাদেশ ছাড়া আমার অন্য কোনো ঠিকানা নেই’। তেমনি তাঁর কন্ঠে ‘এদেশের মাটি ও মানুষই আমার সবকিছু’- একথাটি নিছক আবেগী বাক্য নয়; এটি ছিল তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের সারসংক্ষেপ, যেখানে দেশ ও রাষ্ট্র কেবল শাসনের ক্ষেত্র নয়, অস্তিত্বের পরিসর এবং রাজনীতি ও শাসনের ভিত্তিমূল হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের দু:সময়গুলোই তাঁর দেশপ্রেম প্রতীকী ভাষা ও ব্যঞ্জনা থেকে বাস্তব আত্মত্যাগে রূপ নেয়। যখন বহু রাজনীতিক দু:সময়ে দমন-পীড়নের মুখে কিংবা বিরোধীদের ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বিদেশমুখী হয়েছেন, তখন তিনি জীবননাশের ঝুঁকি জেনেও দেশের মাটিতেই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন। দর্শনের ভাষায় যাকে ‘অস্তিত্বের প্রতিশ্রুতি’ (এক্সিটেনশিয়াল কমিটমেন্ট) বলা যায়, যেখানে বিশ্বাস ও অবস্থানের মধ্যে কোনো ফাঁক থাকে না। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক হান্না আরেন্ট (১৯০৬-১৯৭৫) যে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার কথা বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার আচরণে তারই বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়; রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে থাকার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তিনি কখনওই গ্রহণ করেননি। কারাবাস, অসুস্থতা ও রাষ্ট্রীয় অবহেলার মধ্যেও তাঁর এই অনমনীয় অবস্থান জনগণের কাছে এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। দেশপ্রেম কেবল বক্তৃতা বা দিবসকেন্দ্রিক উচ্চারণে নয়, বরং সংকটকালে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকার দৃঢ়তা ও সাহসে। সেটাই তিনি নিজ জীবনে প্রতিফলিত করে দেখিয়েছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ক্রমশ একটি শক্তিশালী প্রতীকে রূপ নেয়, যেখানে নেতৃত্ব মানে কেবল সুবিধা গ্রহণ নয়, বরং ভোগান্তি বহনের প্রস্তুতিও। এই বাস্তবতা বেগম খালেদা জিয়াকে সমসাময়িক রাজনীতির বহু হিসাবি অবস্থান থেকে পৃথক করে দেয় এবং তাঁকে জনগণের স্মৃতিতে এক অস্তিত্বগত দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে স্থায়ী আসন ও মর্যাদা প্রদান করে। তারই প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই তাঁর জানাযায় জনতার মহাসমূদ্রের উচ্ছ্বাস আর বেদনাবিহ্বল ভালোবাসায়।
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের পটভূমি স্বাধীনতার পর থেকেই বহুমাত্রিক ও জটিল। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহায়ক ভূমিকা ইতিহাসে স্বীকৃত; সেই সহায়তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথে একটি বাস্তব রাজনৈতিক সত্য। সেখানে নানা ‘তবে’ বা ‘কিন্তু’ থাকলেও ইতিহাস সেখানেই থেমে থাকেনি। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ভারতের প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রত্যক্ষ–পরোক্ষ হস্তক্ষেপ নিয়ে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও তীব্র হয়েছে। দেশপ্রেমী বাংলাদেশীদের ভাবিয়ে তুলেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সহযোগিতা ও পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক- এই দুই বাস্তবতার মধ্যে বিবেকহীন বুদ্ধিজীবি ও স্বার্থান্ধ রাজনৈতিক নেতাদের পার্থক্য টানতে ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’-এর প্রতি ভারতের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক সমর্থন ও পক্ষপাতিত্ব জনমনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক উঠে এসেছে, তা কেবল বিরোধী দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আলোচনাতেও উঠে এসেছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান ও নীতিগত সমর্থন কখনো কখনো বাংলাদেশের সার্বভৌম নির্বাচনী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। তারই ফলে জনমনে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে ইতিহাসের পালাক্রমে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে ছোট রাষ্ট্র ও বৃহৎ প্রতিবেশীর সম্পর্ক প্রায়শই ‘সামন্জস্যহীন শক্তির সম্পর্ক’ (এসিমেট্রিক পাওয়ার রিলেশন) দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই অসম সম্পর্ক যদি নৈতিকতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে জটিল করে তোলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই আশঙ্কাই বারবার সামনে এসেছে। যদিও ভারত সবসময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে এবং দাবি করেছে যে তারা দুই দেশের মধ্যে গণতান্ত্রিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে আগ্রহী, তবু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক স্মৃতি জনমনে সন্দেহ ও অস্বস্তি দূর করতে পারেনি। এই জটিল ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভেতরেই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন, আদর্শ ও অবস্থান বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। তিনি ইতিহাসের স্বীকৃতিকে অস্বীকার না করেও ভবিষ্যতের প্রশ্নে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁর রাজনীতি ছিল কৃতজ্ঞতা ও আত্মসমর্পণের মধ্যকার সীমারেখা স্পষ্ট করার রাজনীতি যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু নির্বাচনী ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের মূল্য দিয়ে নয়। এই অবস্থানই তাঁকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের প্রশ্নে আপোষহীন ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি হয়ে ওঠেছেন আধিপত্যবাদী নীলনকশা বাস্তবায়নের পথের কাঁটা আর সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিপীড়িত মানুষের আজাদীর প্রশ্নে লড়ে যাওয়া আগামীর বীরসেনানীদের চেতনার বাতিঘর।
তিনি বহুবার আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহিঃপ্রভাবের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। আর তা হলো বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক পথনির্দেশ ও রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এ দেশের জনগণ; কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা আঞ্চলিক কিংবা বৈশ্বিক শক্তি নয়। তাঁর সেইসব বক্তব্যের ভাষ্য কেবল কূটনৈতিক অভিযোগ নয়, বরং একটি বড় রাষ্ট্রের পাশে আরেকটি ছোট রাষ্ট্রের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে আন্তর্জাতিক নৈতিকতার প্রশ্নে নীতিগত রূপান্তরের প্রয়াস। আঞ্চলিক বাস্তবতায় ক্ষমতায় আরোহন বা দীর্ঘস্থায়ী করতে যেখানে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীরবতা বা সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে, সেখানে বেগম খালেদা জিয়া প্রকাশ্য উচ্চারণে প্রতিবাদের পথকে বেছে নেন। ফলে তিনি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ক্রিয়ানকদের দৃষ্টিতে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠেন, কিন্তু একই সঙ্গে জনগণের কাছে পরিণত হন আপোষহীন রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের প্রতীকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি ‘আদর্শিক প্রতিরোধ’ (নরমেটিভ রেজিসটেন্স) যেখানে শক্তির ভারসাম্য অনুকূলে না থাকলেও নৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাওয়া হয় না। অত্যন্ত সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাসের সাথেই তিনি তা করেছেন।
খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও ধারাবাহিক বক্তব্যে বারবার প্রাধান্য পেয়েছে দেশপ্রেম এবং দেশের মানুষের অধিকার অর্থাৎ বাংলাদেশ-মুখী রাজনীতির পক্ষে তাঁর একটি দৃঢ় অবস্থান। তাঁর রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ কখনোই সংকীর্ণ অর্থে নয়; বরং রাষ্ট্রের মর্যাদা, জনগণের সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা ও স্বাধীন ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আন্দোলের ইতিহাসও তাঁর এই অবস্থানকে আরও অর্থবহ করে তোলে। তিনি ১৯৪৫ সালে ঔপনিবেশিক ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করলেও ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তাঁর পরিবার চলে আসে স্বাধীন বাংলাদেশের দিনাজপুরে। সেই সময় থেকেই ভৌগোলিক আ্ত্মপরিচয়ের চেয়ে দেশের প্রশ্নে রাজনৈতিক, নৈতিক ও আদর্শিক পরিচয় তাঁর কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। পরবর্তী জীবনে তিনি নিজেকে কখনোই সীমান্তের ওপারের কোনো স্মৃতির সঙ্গে সংজ্ঞায়িত করেননি; বরং সবসময় নিজেকে বাংলাদেশি নাগরিক ও বাংলাদেশি রাজনীতিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই ধারাবাহিক আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থানই প্রমাণ করে তাঁর জাতীয়তাবাদ জন্মসূত্রে নয়, নির্বাচিত ও চর্চিত জীবনবোধের গভীরে প্রোথিত ছিল। আর সে কারণেই বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের জন্য আধিপত্যবাদবিরোধী ও জনগণনির্ভর রাজনীতির এক স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আর এখানেই তাঁর অনন্যতা এবং তাঁর দেশের জনগণের কাছে তিনি অর্জন করেছে দেশনেত্রীর অবিসংবাদিত শিরোপা।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির প্রেরণাকেন্দ্রে ছিল স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শিক উত্তরাধিকার। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীনতা, আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রচিন্তা এবং সর্বোপরি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই দর্শন তিনি কেবল আবেগে ধারণ করেননি; বরং রাজনৈতিক জীবনে লালন-পালনের চেষ্টা করেছেন এবং সক্ষমতার শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সচেতনভাবে বহন করেছেন। সময়, ক্ষমতা কিংবা পরিস্থিতির চাপে এই আদর্শ থেকে তিনি কখনো একচুলও সরে আসেননি; এটাই তাঁকে সমসাময়িক বহু নেতার থেকে আলাদা করেছে। ব্যক্তিগত জীবনে সীমাহীন ত্যাগ, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, কারাবাস ও রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা সত্ত্বেও দেশ ও দেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল অবিচল। তিনি বহুবার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তাঁর নিজের পরিচয়, দায়–দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। নানা অত্যাচার ও অবিচারের শিকার হয়েও বিদেশিদের সান্ত্বনা, নিরাপদ আশ্রয় কিংবা সুবিধাজনক প্রবাসজীবন কখনোই তাঁর কাছে বিকল্প হয়ে ওঠেনি। বরং বারবার উচ্চারণ করেছেন, ‘বাংলাদেশ ভালো থাকলে আমি ভালো থাকি’। ‘এদেশের বাহিরে আমার কোন ঠিকানা নেই- এদেশ, মাটি, মানুষই আমার শেষ ঠিকানা’। এমন উচ্চারণই তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও অনুশীলনের সারমর্ম হয়ে উঠেছে। একারণেই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘আমার স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না’।
তাঁর রাজনীতিতে দেশপ্রেম কোনো মৌসুমি স্লোগানের বিষয় ছিল না; বরং তা ছিল একটি ধারাবাহিক নৈতিক অবস্থান। খালেদা জিয়া সবসময়ই দেশের সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক গণতন্ত্র এবং জাতীয় স্বার্থকে বিন্দু পরিমান ছাড় দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা, জনগণের ভোটাধিকার এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রশ্নে তিনি আপোষের পথ বেছে নেননি। রাষ্ট্রচিন্তার দৃষ্টিতে তিনি সেই ধারারই প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, যেখানে নেতৃত্ব মানে সুবিধাভোগ নয়, বরং দায়িত্ব বহনের সাহস ও নৈতিক-দায়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি একজন দৃঢ়চেতা, স্পষ্টভাষী ও দেশপ্রেমিক নেত্রীকে হারাল যাঁর কণ্ঠ কখনো দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি, দেশ ও জনগণের স্বার্থে যিনি নিজ স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে কুন্ঠিত হননি, যাঁর অবস্থান মানুষের কাছে কখনো অস্পষ্ট ছিল না। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে গভীর আদর্শিক বার্তাটি রেখে গিয়েছে, সেটি হলো: রাজনীতি কেবল ক্ষমতার খেলা নয়; এটি আত্মমর্যাদা, নৈতিক সাহস এবং জাতির স্বার্থে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার নাম। দেশ ও দেশের মানুষকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসলে কোনো স্বৈরশাসক কিংবা কোনো বর্হিশক্তির সঙ্গে আপোষ করা যায় না। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মূল্য যদি কারাবাস, নির্যাতন কিংবা নিঃসঙ্গতাও হয়, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থানকেই স্বীকৃতি দেয় এবং সম্মান জানায়।
অবিসংবাদিতভাবে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন এমন এক আপোষহীন নেত্রী, যিনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘকাল দেশের রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় থেকেছেন। তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক চর্চায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং মানুষের মৌলিক অধিকার- এই তিনটি বিষয়ই কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিপালিত হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালেও তাঁর অবস্থান বদলায়নি; বরং রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক প্রশ্নে তিনি ছিলেন আদর্শিক, ধারাবাহিক ও সুস্পষ্ট। তিনি সামরিক শাসন, স্বৈরাচার এবং একপাক্ষিক সিদ্ধান্তগ্রহণের রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন এবং জনগণের ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন। গণতন্ত্র তাঁর কাছে ছিল কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, বরং নাগরিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করার একটি নৈতিক কাঠামো। এই কারণে তিনি বারবার রাষ্ট্রক্ষমতার দলীয় নেতৃত্বে কেন্দ্রীভূত করার বিপরীতে জনগণের ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি সামনে এনেছেন যা তাঁকে শাসক হোক কিংবা বিরোধী, উভয় অবস্থানেই রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। তারই প্রতিফল ঘটেছে দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে তাঁর সর্বশেষ সংযমী উচ্চারণেও, বিশেষ করে স্বৈরশাসকের পলায়নের পর, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলে’ জাতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মাঝ দিয়ে।
বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমিক মনোবৃত্তি ও রাজনৈতিক আদর্শের স্থিতিশীলতায় দেশকে অটল রাখার প্রচেষ্টাই তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী বিরোধী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো জটিল ও সংকটপূর্ণ পর্যায়ে ছিল, তখন তাঁর আপোষহীনতা অনেকের কাছে বিব্রতকর হলেও দেশের আপামর জনগণের একটি বড় অংশের কাছে তা ছিল আস্থার উৎস। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের মতে, সংকটকালে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণকারী নেতৃত্বই দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকে। যদিও রাজনীতি কখনোই একমাত্রিক বিচারে মূল্যায়নযোগ্য নয়, তবুও বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম, সাংবিধানিক গণতন্ত্রের পক্ষে অবিচল অবস্থান এবং বাংলাদেশি রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের জায়গা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি প্রমাণ করেছেন নারীর নেতৃত্ব কেবল প্রতীকী নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক সাহসের প্রশ্নে সমানভাবে প্রভাবশালী হতে পারে। এই কারণেই বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি সময়ের রাজনীতিক নন; তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অধিকার, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনিবার্য নাম।

* লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।



বিষয়: #  #


আর্কাইভ

সিলেট শহরের সকল হবিগঞ্জী --- --- --- --- --- --- --- ---

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)
শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্ট্রাসবার্গ আদালত
নিকটজন হারানোর শূন্যতা পেরিয়ে পুরো দেশই আমার পরিবার : তারেক রহমান
জামিন নিতে এসে পিটুনিতে প্রাণ গেল আইনজীবীর
বছরের প্রথম দিন ঢাকায় তাপমাত্রা নামল ১৩ ডিগ্রিতে
নতুন বছরে আরও জোরদার হোক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
2026 সালের নববর্ষ উদযাপন লাইভ!
খালেদা জিয়ার জানাজায় পদদলিত হয়ে একজনের মৃত্যু
মায়ের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানালেন তারেক রহমান
নতুন বছরে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলব: প্রধান উপদেষ্টা
পাড়ি জমালেন পরপারে : অনন্ত যাত্রায় মানুষের ভালোবাসা